অভাবের সংসারে ঈদের উপহার, মুহূর্তে লাখপতি অসহায় মাসুদ-হরমুজা
অভাবের সংসারে ঈদের উপহার, মুহূর্তে লাখপতি অসহায় মাসুদ-হরমুজা
নিজস্ব প্রতিবেদক :
অভাব যেন তাদের জীবনের নিত্যসঙ্গী। কোনোদিন পেট ভরে খাওয়া, কোনোদিন অনাহার-অর্ধাহারে কাটানো—এভাবেই চলছিল প্রতিবন্ধী মাসুদ মিয়া ও হরমুজা বেগমের জীবনসংগ্রাম। সংসারের দুঃখ-দুর্দশার সঙ্গে লড়াই করতে করতে তারা প্রায় হারিয়ে ফেলেছিলেন স্বপ্ন দেখার সাহসও।
কিন্তু ঈদের আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই নোয়াখালীর সেনবাগে ঘটল এক ব্যতিক্রমী মানবিক ঘটনা। সহায়তা পেয়ে এক লাখ টাকা করে হাতে তুলে নিয়ে মুহূর্তেই লাখপতি হয়ে গেলেন এই দুই অসহায় মানুষ। আনন্দে, বিস্ময়ে আর আবেগে তাদের চোখ ভিজে ওঠে।
মাসুদ মিয়া শারীরিক অসুস্থতার কারণে নিয়মিত কাজ করতে পারেন না। একদিন কাজ করলে কয়েকদিন বিশ্রামে থাকতে হয়। এতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে প্রায়ই মানবেতর জীবনযাপন করতে হতো তাকে। অন্যদিকে মানুষের দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভর করেই দিন চলত হরমুজা বেগমের।
জানা গেছে, সেনবাগ উপজেলার সৈয়দ হারুন ফাউন্ডেশন অসহায় ও হতদরিদ্র মানুষের নামের টোকেন তৈরি করে শুক্রবার (২৯ মে) রাতে সেনবাগের রুহুল আমিন একাডেমিতে লটারির আয়োজন করে। এবার সেই লটারিতে নির্বাচিত হন মাসুদ মিয়া ও হরমুজা বেগম।
পূর্বঘোষণা অনুযায়ী ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান লায়ন সৈয়দ হারুন নিজ গাড়িতে করে তাদের বাড়ি থেকে অনুষ্ঠানে নিয়ে আসেন। পরে ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়। সম্মান জানিয়ে আয়োজন করা হয় বিশেষ ভোজেরও।
নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার ৫ নম্বর অর্জুনতলা ইউনিয়নে আয়োজিত এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ইতোমধ্যে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। গত চার বছর ধরে প্রতি ঈদের পরদিন এমন আয়োজন করে আসছে সংগঠনটি। এ পর্যন্ত ৯ জন অসহায় মানুষকে লাখপতি করেছে ফাউন্ডেশনটি।
এছাড়া অনুষ্ঠানে ‘স্বপ্নের বাজার’ নামে একটি সহায়তা প্রকল্পের আওতায় লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত সাতটি পরিবারের সদস্যদের নিজেদের পছন্দমতো বাজার করার সুযোগ করে দেওয়া হয়। বাজারের সবচেয়ে বড় মাছ, মুরগি কিংবা প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কেনার সুযোগ পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন সুবিধাভোগীরা।
হরমুজা বেগম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, কখনো ভাবিনি জীবনে এমন দিন আসবে। মানুষের সহযোগিতায় কোনোভাবে দিন চলত। আজ এক লাখ টাকা সহায়তা পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত। এই টাকা দিয়ে একটা গাভী ও জমি কিনে চাষাবাদ করে স্বাবলম্বী হতে চাই।
প্রতিবন্ধী মাসুদ মিয়ার স্ত্রী বলেন, আমার স্বামী অসুস্থ থাকায় নিয়মিত কাজ করতে পারেন না। সংসার চালাতে আমাদের অনেক কষ্ট হতো। এই সহায়তা আমাদের জন্য নতুন আশার আলো হয়ে এসেছে। মেয়ের বিয়ের বয়স হয়েছে, কিন্তু অর্থের অভাবে আয়োজন করতে পারছিলাম না। এই টাকা দিয়ে মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করব এবং সংসারের অভাব দূর করার চেষ্টা করব।
ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান লায়ন মো. সৈয়দ হারুন বলেন, আল্লাহ আমাকে সফলতা ও সম্পদ দিয়েছেন। আমি সবসময় চেয়েছি সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে। ইতোমধ্যে ৯ ওয়ার্ডের ৯ জন লাখপতি হয়েছেন। গতানুগতিক সহায়তার বাইরে ব্যতিক্রম কিছু করতে চেয়েছি। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
সৈয়দ হারুনের সহধর্মিণী সৈয়দা শেলী বলেন, সমাজে অনেকেই ৫০০ বা ১ হাজার টাকা দিয়ে সাময়িক সহায়তা করেন, যা দিয়ে একটি অসহায় পরিবারের একদিনও ঠিকমতো চলে না। এতে তাদের কষ্ট কিছুটা লাঘব হলেও জীবনের বাস্তব পরিবর্তন আসে না। আমার স্বামীর বিশ্বাস, একজন মানুষকে সত্যিকার অর্থে স্বাবলম্বী করতে হলে এমন সহায়তা দিতে হবে, যা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। তাই একসঙ্গে এক লাখ টাকা দিয়ে আমরা চেষ্টা করছি তাদের নতুনভাবে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিতে। আমাদের স্বপ্ন, আজ যারা সহায়তা পাচ্ছেন, একদিন তারাই সমাজের অন্য অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবেন।
রমজানুল ইসলাম বিজয়ের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিটি কলেজের অধ্যক্ষ হুমায়ুন কবির, সৈয়দ রুহুল আমিন স্মৃতি একাডেমির শিক্ষক আবদুর সত্তার, সাবেক চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সাধন, মির্জা সোলায়মান, ছিলোনিয়া ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কামাল উদ্দিন, সৈয়দ হারুনের সহধর্মিণী সৈয়দা শেলী, ছোট মেয়ে সৈয়দা তনিমা তাসনিম এবং লাখপতি প্রজেক্টের স্বপ্নদ্রষ্টা সৈয়দ রাহাতসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
নিউজটি আপডেট করেছেন :
[email protected]
কমেন্ট বক্স